লিভারে অধিক চর্বি জমলে যা করবেন

দিন দিন দেশে লিভারে চর্বি বা ফ্যাটি লিভারের রোগীর সংখ্যা বেড়েই চলেছে। বলা যায়, ফ্যাটি লিভারের রোগী এখন ঘরে ঘরে। তবে জীবনযাপন এবং খাদ্যাভাসে কিছুটা পরিবর্তন আনলে এ রোগ অনেকটাই প্রতিরোধ করা সম্ভব। কোনো কোনো ক্ষেত্রে উপসর্গ না থাকলেও লিভার সিরোসিস ও লিভার ক্যান্সারের বড় কারণ কিন্তু এ ফ্যাটি লিভার।

লিভারের এই চর্বি নিয়ে একেকজনের চিন্তা-ভাবনা একেক রকম। অনেকটা কভিড-১৯ এর মতো। কারো কারো ধারণা, লিভারে চর্বি মানেই লিভার শেষ, জীবনও শেষ! আবার কারো কারো কাছে এটা কোনো বিষয়ই না। এই দুই ধরনের রোগীই ভিড় করে লিভার বিশেষজ্ঞদের চেম্বারে। হেপাটাইটিস ‘বি’র পর লিভারের রোগ ফ্যাটি লিভারের প্রকোপ বেশি দেখা যাচ্ছে। এ বিষয়ে গণমাধ্যমে পরামর্শ দিয়েছেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের লিভার বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. মামুন আল মাহতাব স্বপ্নীল:

ফ্যাটি লিভার কী?
ফ্যাটি লিভার মানে হলো লিভারে অতিরিক্ত চর্বির উপস্থিতি। আমরা প্রতিদিন যে খাবার খাই তার কিছু অংশ লিভারে জমা থাকে চর্বি হিসেবে। অতিরিক্ত পরিশ্রম কিংবা অসুখবিসুখের সময় এ সঞ্চিত চর্বি থেকে দেহের প্রয়োজনীয় শক্তির জোগান দেয় লিভার। তবে ‘বেশি ভালো ভালো নয়’- কথাটির মতো লিভারে অতিরিক্ত চর্বি থাকাও স্বাস্থ্যের জন্য ভালো নয়। লিভারে ৫ শতাংশের বেশি চর্বি জমলে তাকে লিভারের রোগ- ফ্যাটি লিভার ধরা হয়। কিন্তু ব্যক্তিভেদে এ চর্বির পরিমাণ ৭০-৮০ শতাংশও পাওয়া যাচ্ছে।

উপসর্গ: লিভারে এ বাড়তি চর্বির কারণে প্রাথমিকভাবে কারোর কোনো সমস্যা বা উপসর্গ না-ও দেখা দিতে পারে। অর্থাৎ অন্য বেশির ভাগ ক্রনিক লিভার রোগীর মতো ফ্যাটি লিভারেরও প্রায়ই তেমন লক্ষণ থাকে না। তবে কিছু উপসর্গ দেখা দিতেও পারে। যেমন:

# পেটের ডান পাশে ওপরের দিকে ব্যথা।

# ভার ভার ভাব বা অস্বস্তি।

# দুর্বলতা বা খুব অল্প পরিশ্রমেই ক্লান্ত হয়ে পড়া ইত্যাদি।

কারণ: লিভারে চর্বি জমার অনেক কারণ রয়েছে। এর মধ্যে প্রধান কারণ হলো অতিরিক্ত মোটা বা মেদবহুল শরীর। পাশাপাশি ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, ডিজলিপিডেমিয়া, হাইপোথাইরয়েডিজম, হেপাটাইটিস ‘সি’ ভাইরাস ইনফেকশন, নারীদের পলিসিস্টিক ওভারি সিনড্রোম, অ্যালকোহল পান ইত্যাদিও বড় কারণ। বলা যায়, লিভারে চর্বি জমার ৯০ শতাংশের বেশি কারণ এগুলো।

পরীক্ষা: কারো লিভারে চর্বি আছে কি না, লিভারটা কতটা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বা আদৌ কোনো ক্ষতির মধ্যে আছে কি না তা জানা যায় কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে। এসব দেখার জন্য আলট্রাসনোগ্রামসহ রয়েছে লিভার ফাংশন কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষা। এসব পরীক্ষার তালিকায় সর্বশেষ সংযোজনটি ফাইব্রোস্ক্যান। যার মাধ্যমে খুব সহজেই বলে দেওয়া সম্ভব লিভারে চর্বির পরিমাণ কত শতাংশ আর লিভারের ক্ষয়ক্ষতিই বা কতখানি।

ওষুধ: লিভারে চর্বি কমানোর ওষুধ আছে কি না এ প্রশ্ন অনেকের। ইদানীং আমাদের কাছে এর ভালো উত্তর আছে। ‘অবিটাকলিক এসিড’ নামে প্রাইমারি বিলিয়ারি সিরোসিসের এফডিএ অনুমোদিত নতুন একটি ওষুধ রয়েছে। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, এটি শুধু লিভারের চর্বিই কমায় না, লিভারের ফাইব্রোসিস বা ক্ষতির মাত্রাও কমায়। আশার কথা, এ ওষুধ এখন দেশেই তৈরি হচ্ছে ও সহজেই পাওয়া যাচ্ছে।

প্রতিরোধের উপায়: লিভার ভালো রাখতে ফিট থাকার কোনো বিকল্প নেই। ফ্যাটি লিভার থেকে বাঁচার বা প্রতিরোধের কার্যকর উপায় হলো জীবনযাপন ও খাদ্যাভ্যাসের ধরন পরিবর্তন করে ডায়াবেটিস, ওজন নিয়ন্ত্রণ বা লিপিড প্রফাইল ঠিক রাখার চেষ্টা করা। এ জন্য কিছু করণীয় হলো:

# স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের ধরন মেনে চলতে হবে।

# ব্যায়াম বা শারীরিক শ্রম বাড়াতে হবে।

# নিয়ন্ত্রিত খাবারের সঙ্গে সঙ্গে শরীরচর্চা করতে হবে।

# মেটাবলিক সিনড্রোম, ডায়াবেটিস, কোলেস্টেরল বৃদ্ধি, হেপাটাইটিস ভাইরাসজনিত কোনো সমস্যা থাকলে সঠিক চিকিৎসা নিতে হবে।

খাবারদাবার:

# ওজন, উচ্চতা, কাজের ধরন, শারীরিক অবস্থা বিবেচনা করে নিয়মিত সুষম ও পুষ্টিকর খাবার খাওয়া উচিত।

# ফাইবার বা খাদ্য আঁশসমৃদ্ধ সবজি ও শস্য যেমন- ব্রোকলি, পালংশাক, কচুশাক ইত্যাদি খান।

# বিভিন্ন রঙের শাকসবজি ও ফলমূল খাওয়ার অভ্যাস করুন।

# ভালো হয় লাল আটার রুটি বা লাল চালের ভাত নিয়মিত খেতে পারলে।

# সঠিক পরিমাণে প্রোটিনজাতীয় খাবার খাদ্যতালিকায় প্রতিদিন রাখুন।

# লো ফ্যাট, লো ক্যালরি ডায়েট গ্রহণ করুন।

# সামুদ্রিক মাছ যেমন টুনা, সারডিন, লো ফ্যাট দুধ ও দুধের তৈরি খাবার, রসুন, গ্রিন টি, অ্যাভোক্যাডো, ওটস ইত্যাদি।

বাদ দিন:
# অ্যালকোহল পরিহার করুন।

# চর্বিজাতীয় খাবার বাদ দিন।

# খুব কম পরিমাণে চিনি, লবণ, রিফাইনড কার্বোহাইড্রেট বা শর্করা এবং সম্পৃক্ত ফ্যাট গ্রহণ করুন।

# তেলে ভাজা খাবার, অতিরিক্ত লবণ, লাল মাংস বর্জন করুন।

লিভারের একটি জটিল রোগ ফ্যাটি লিভার, এ কথা সত্য। কাজেই একে হেলাফেলা করার কোনো সুযোগ নেই। তাই বলে এমনটা মনে করা উচিত না যে এটি চিকিৎসার অযোগ্য কোনো রোগ। নিয়মিত চিকিৎসা আর সঙ্গে সাধনায় লিভারের চর্বি আনা যায় নিয়ন্ত্রণে আর ঠেকানো যায় লিভারের ক্ষতি।