তবুও নজর নেই মান পর্যবেক্ষণে

দেশে করোনার প্রকোপ দেখা দেওয়ার পর দীর্ঘ ৮ মাস পার হলেও নমুনা পরীক্ষার মান পর্যবেক্ষণ ও নিয়ন্ত্রণের বেহাল দশা এখনো কাটেনি। করোনায় আক্রান্ত বিশ্বের প্রায় প্রতিটি দেশেই জাতীয় ল্যাবরেটরির মাধ্যমে কোয়ালিটি অ্যাসিউরেন্স সিস্টেম বা কোয়ালিটি কন্ট্রোল সিস্টেম প্রতিষ্ঠা করা হলেও বাংলাদেশে এ উদ্যোগ এখনো নেওয়া হয়নি। অদক্ষ টেকনোলজিস্ট দিয়ে ভুলভাবে নমুনা সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও নিম্নমানের কিট দিয়ে পরীক্ষাসহ নানা কারণে প্রায়ই ‘ফলস নেগেটিভ’ এবং ‘ফলস পজিটিভ’ ফলাফল আসছে, যা করোনা মহামারি রোধে বড় অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা জানান, মৃদু ও মাঝারি উপসর্গ থাকার পরও নমুনা পরীক্ষায় নেগেটিভ ফল পাওয়া গেলে বেশির ভাগ মানুষ নিজেকে করোনামুক্ত ভাবছেন। এ কারণে তারা আইসোলেশনে না থেকে স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করছেন। অথচ নেগেটিভ রেজাল্ট আসা প্রায় ২০ শতাংশ মানুষ করোনায় আক্রান্ত। তাদের মাধ্যমে পরিবারের সদস্য ও সহকর্মীসহ আশপাশের লোকজন সংক্রমিত হচ্ছেন। এদের মধ্যে বয়োবৃদ্ধ এবং যাদের শরীরে প্রতিরোধ ক্ষমতা কম ও বিভিন্ন জটিল রোগে আক্রান্ত তারা গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়ছেন। এমনকি চিকিৎসাধীন অবস্থায় অনেকে মারাও যাচ্ছেন।

বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা বলছেন, শুধু মান পর্যবেক্ষণের বেহাল দশার কারণেই দেশে রিজেন্ট ও জেকেজির মতো বেশকিছু ভুঁইফোড় প্রতিষ্ঠানের পক্ষে নমুনা পরীক্ষায় জাল-জালিয়াতি ও প্রতারণার সুযোগ সৃষ্টি হয়, যা দেশের বিপুলসংখ্যক মানুষকে চরম ভোগান্তি ও হয়রানির মুখে ঠেলে দিচ্ছে। বহির্বিশ্বেও বাংলাদেশের নমুনা পরীক্ষার মান নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এরপরও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের এ ব্যাপারে জোরাল কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। অজ্ঞাত কারণে নমুনা পরীক্ষার মান নিয়ন্ত্রণে জাতীয় ল্যাবরেটরি কাজে লাগানো হয়নি।

রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট সূত্রে জানা গেছে, দেশ থেকে করোনা নেগেটিভ সনদ নিয়ে গত ৬ জুলাই ইতালিতে যাওয়া বিপুলসংখ্যক যাত্রীর কোভিড-১৯ শনাক্ত হলে বেসরকারি হাসপাতালগুলোর নমুনা পরীক্ষার ল্যাবগুলোর মান সম্পর্কে জানতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে প্রতিবেদন চাওয়া হয়। আইইডিসিআরের একটি দল বেশ কয়েকটি বেসরকারি হাসপাতাল পরিদর্শন করে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে দেওয়া প্রতিবেদনে দাবি করেছে, অনেক হাসপাতালে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও প্রশিক্ষিত কর্মী নেই। একই যন্ত্রপাতি বিভিন্ন জায়গায় ব্যবহৃত হচ্ছে। এছাড়া কোনো কোনো

\হহাসপাতালের নমুনা পরীক্ষায় নিম্নমানের রি-এজেন্ট ব্যবহারের প্রমাণ পায় প্রতিনিধিদল। এ সংক্রান্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার পর এসব হাসপাতালের নমুনা পরীক্ষা বন্ধ করা হয়েছে- এমন কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি বলে আইডিসিআরের একাধিক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা স্বীকার করেন।

বাংলাদেশে করোনাভাইরাসের পরীক্ষা শুরু হওয়ার প্রথম দিকেই বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, বাংলাদেশে যে আরটিপিসিআর পদ্ধতিতে পরীক্ষা করা হয়, সেই পদ্ধতিতে পরীক্ষার ফলে ১০ শতাংশ ‘ফলস নেগেটিভ’ আসতে পারে। এ হার ২০ শতাংশে এসে ঠেকেছে। যার কারণে দুই ল্যাবে একই সময় একই ব্যক্তির দুই ধরনের ফল, ১০ থেকে ১৫ দিন পর ফল পাওয়া এবং একজনের নমুনা পরীক্ষার ফল আরেকজনকে পাঠানোর মতো ঘটনা অহরহ ঘটছে। অথচ এরপরও নমুনা পরীক্ষার মান পর্যবেক্ষণে জোরাল কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়নি।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, পরীক্ষার কোনো ধাপগুলো কীভাবে হবে, সব ল্যাবকে সে ব্যাপারে একটি ‘স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসেডিওর’ দেওয়া আছে। সেটা ঠিকমতো অনুসরণ করা না হলে ভুল হতে পারে। অথচ এসব প্রসেডিওর সঠিকভাবে অনুসরণ করা হচ্ছে কিনা তা পর্যবেক্ষণে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের নিয়মিত তদারকি নেই।

সংশ্লিষ্টরা জানান, করোনাভাইরাস মহামারির সুযোগে এক শ্রেণির অসৎ উৎপাদনকারী মানহীন নমুনা সংগ্রহের কিট এবং আরটি-পিসিআর কিট উৎপাদন করে বিশ্বব্যাপী বাজারজাত করেছে। সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় বিশেষজ্ঞ ব্যক্তির অনুপস্থিতি এবং ব্যাপক চাহিদার সুযোগে এসব মানহীন কিট অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও বাধাহীনভাবে ঢুকে পড়ে। অনেক দেশ মানহীন এসব কিট উৎপাদনকারীর কাছে ফেরত পাঠালেও বাংলাদেশের এ ধরনের কোনো নজির নেই। এ অবস্থায় দেশে নমুনা পরীক্ষার মান পর্যবেক্ষণের তেমন কোনো পদক্ষেপ না থাকায় বেসরকারি অনেক ল্যাবে এসব কিট ব্যবহার হচ্ছে। ফলে বিপুলসংখ্যক ফলস রেজাল্ট আসছে।

করোনা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণকারী বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা জানান, দেশের ল্যাবরেটরিগুলোতে অনেক দক্ষ-অভিজ্ঞ অণুজীব বিজ্ঞানী-মলিকুলার বিজ্ঞানী কাজ করছেন। তবে মান নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার সাথে সম্পর্কিত সব উপাদান তাদের নিয়ন্ত্রণে নেই। মান নিয়ন্ত্রণে সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান যন্ত্রপাতি আর কিট কেনায় তাদের মতামত গ্রহণ করা হচ্ছে না। ফলে মানহীন কিট ও যন্ত্রপাতির কারণে নমুনা পরীক্ষার ভুল ফল আসছে। অথচ স্বীকৃত গাইডলাইন অনুসারে ল্যাবগুলোতে করোনাভাইরাস পরীক্ষার প্রয়োজনীয় উপাদান ব্যবহার করা হচ্ছে কিনা তা নিয়মিত মনিটর করা হলে মানসম্পন্ন রিপোর্ট অনায়াসে নিশ্চিত করা যেত।

দেশে করোনা পরীক্ষার মান সঠিকভাবে পর্যবেক্ষণ হচ্ছে কিনা জানতে চাইলে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের সাবেক উপদেষ্টা মোজাহারুল হক যায়যায়দিনকে বলেন, করোনা পরীক্ষার মান নিয়ন্ত্রণের জন্য জাতীয় ল্যাবরেটরি থাকা জরুরি। সেই ল্যাবরেটরির কাজই হলো নমুনা পরীক্ষার মান পরীক্ষা করে দেখা। সোয়াবটা সঠিকভাবে নেওয়া হচ্ছে কিনা; ব্যবহৃত রি-এজেন্ট সঠিক কিনা; পরীক্ষা পদ্ধতি ঠিক আছে কিনা- এগুলো দেখার দায়িত্ব ন্যাশনাল রেফারেন্স ল্যাবরেটরির। পৃথিবীর অন্যান্য দেশে এভাবেই মান নিয়ন্ত্রণ করা হয়। বাংলাদেশে এই পদ্ধতিটা নেই। এর ফলে অনেক সময় পজিটিভ রোগীর নেগেটিভ এবং নেগেটিভ রোগী পজিটিভ ফল আসছে। এ কারণে নিজের অজান্তেই অনেকে চারদিকে রোগ ছড়াচ্ছে। অন্যদিকে নেগেটিভ রোগীর পজিটিভ রেজাল্ট আসায় নানা ধরনের বিড়ম্বনার শিকার হচ্ছে।

এ পরিস্থিতিতে দেশে যে জাতীয় ল্যাবরেটরি আছে, সেটাকে করোনার পরীক্ষার মান পর্যবেক্ষণের দায়িত্ব দেওয়ার পরামর্শ দেন মোজাহারুল হক। তিনি বলেন, তাদের মাধ্যমে এর কোয়ালিটি (মান) নিশ্চিত করার ব্যবস্থা করা জরুরি। যেখানে যেখানে পরীক্ষা হয়, সেই সব জায়গায় এরা গিয়ে ল্যাবরেটরির কোয়ালিটি নিশ্চিত করবে। স্বাস্থ্য বিজ্ঞানের ভাষায় একে কোয়ালিটি অ্যাসিউরেন্স সিস্টেম বা কোয়ালিটি কন্ট্রোল সিস্টেম বলা হয় জানিয়ে তিনি বলেন, বিশ্বের অধিকাংশ দেশে এটার মাধ্যমেই ল্যাবরেটরি পরীক্ষার কোয়ালিটি ম্যানেজমেন্ট করা হয়।

এ প্রসঙ্গে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরী যায়যায়দিনকে বলেন, নমুনা সংগ্রহ, সংরক্ষণ, পরিবহণ এটি একটি চেইনের মতো। সেখানে নজরদারি নেই। যন্ত্রে নমুনা লোড করা পর্যন্ত এই চেইন ঠিকমতো কাজ না করলে নির্ভুল পরীক্ষার হার কমে আসে। যন্ত্র পর্যন্ত যাওয়ার আগে যে ব্যবস্থা, সেখানেই সম্ভবত কোনো ঘাটতি রয়েছে। তিনি মনে করেন, করোনাভাইরাসের নমুনা পরীক্ষার সংখ্যা বাড়ানোর জন্য যে প্রচেষ্টা দেশে দেখা গেছে, এর মান নিয়ন্ত্রণে সেরকম প্রচেষ্টা নেই।