স্বস্তির নিঃশ্বাস নেয়াই কঠিন

বেলায়েত বাবলুঃ করোনার প্রার্দূভাব বেড়ে যাওয়ার কারণে মার্চ, এপ্রিল ও মে এই তিন মাস সবকিছু যেন থমকে দাঁড়িয়েছিল। কর্মহীন পড়েছিল অগনিত মানুষ।

 

৩১ মে থেকে সাধারণ ছুটি বাতিল হওয়ায় সবকিছু স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে। কর্মহীন হয়ে পড়া মানুষগুলো আবারও বেরিয়ে পড়েছে কাজের সন্ধানে। কিন্তু কাজের সন্ধানে বের হয়ে দিনশেষ ঘরে ফিরে তারা যেন স্বস্তির নিঃশ্বাস নিতে পারছেন না।

 

তিনমাসের ঘর ভাড়ার জন্য বাড়ীওয়ালা তাগিদ দিচ্ছেন। সাথে যোগ হয়েছে তিন মাসের ভৌতিক বিদ্যুৎ বিল। বাড়ীওয়ালা আল্টিমেটাম দিচ্ছেন বাড়ী ভাড়া আর বিদ্যুৎ বিল একসাথে পরিশোধ করতে হবে। কোন কোন বাড়ীওয়ালা এক্ষেত্রে কিছুটা মানবিক হলেও বেশীরভাগ বাড়ীওয়ালা অমানবিকতার পরিচয় দিচ্ছেন। বকেয়া পরিশোধ করে কেউ কেউ বাড়ি ছেড়ে ছেড়ে দিতে বলছেন।

 

এক্ষেত্রে ভাড়াটিয়ারা করনীয় খুঁজে না পেয়ে চরম হতাশায় ভুগছেন। এসকল ভাড়াটিয়াদের মধ্যে যারা আবার দোকান ভাড়া নিয়ে ক্ষুদ্র ব্যবসা চালিয়ে আসছিলেন তারা পড়েছেন মহা বিপাকে। দোকানঘর খোলার সাথে সাথে দোকান মালিক ভাড়া দাবি করছেন। সাথে জমেছে বিদুৎ বিলও। দোকান মালিক অনেক ক্ষেত্রে ১০ দিনের সময় দিতেও রাজি হচ্ছেন না। দোকান মালিকের তাগিদার মধ্যেই দোকানে হাজির হচ্ছে বিভিন্ন সমিতির লোকজন।

 

বাড়ীওয়ালাদের মতোই তারাও তাগিদ দিচ্ছেন। কিস্তির টাকা পরিশোধ না করলে সামনে আর লোন দেয়া হবেনা মর্মে শাসিয়ে যাচ্ছে। সকল পাওনাদারের চাপ সামলে বাসায় ফিরলে তাতেও স্বস্তি নেই। দরজার কড়া নাড়তেই সন্তান ছুটে আসছে বাবা কি খাবার নিয়ে এসেছে তা দেখার জন্য। খালি হাতে ঘরে ফেরা বাবা তখন হতাশা লুকিয়ে সন্তানকে আগামীকাল এনে দেবার মিথ্যা সান্তনা দিচ্ছে। ঘরে ফিরে কি রান্না হয়েছে স্ত্রীকে আর জিজ্ঞেস করার সাহসটুকুও হারিয়ে ফেলছে অনেকেই। কারণ বাজার করে এনে দিতে না পারলে কি রান্না হয়েছে তা জিজ্ঞেসও বা কিভাবে করে।

 

তারপর বেলাশেষে স্ত্রী যখন যা জুটেছে তাই রান্না করে সামনে দিয়ে বলে কালকে চাল না আনলে কিন্তু রান্না হবেনা তখন সুস্বাদু খাবারও গলা থেকে নামতে চায়না। এভাবে সারাটা দিন কাটিয়ে দেয়ার পর রাতে বিছানায় গিয়ে ঘুমানোর চেষ্টা করেও ব্যর্থ হতে হয়। কারণ সকালে উঠেই আবার পাওনাদারের মুখোমুখি হতে হবে।

 

 

তাদেরকে আরেক দিনের জন্য ম্যানেজ করা গেলেও চাল তো কিনতেই হবে। না হলে সন্তানরাও যে না খেয়ে থাকবে। উল্লেখিত চিত্র এখন দেশের প্রতিটি আনাচে কানাচে। ঘরের চাপ, বাইরের চাপ সামলাতে না পেরে অনেকই অসুস্থ হয়ে পড়ছে। আবার অসুস্থ হলে রয়েছে ভিন্ন রকমের চাপ। চিকিৎসা নিতে গেলেইতো টাকার দরকার হবে। সেই টাকা আসবে কোথা থেকে।

 

বেঁচে থাকার জন্য হয় আবার কারো কাছে হাত পেতে কিছু টাকার জোগাড় হলো। কিন্তু তারপরেও কি চিকিৎসা মিলবে? করোনার ভয়ে অনেক খ্যাতিমান চিকিৎসক প্রাইভেট প্রাকটিস বন্ধ করে দিয়েছেন। হাসপাতালে গেলেও যে চিকিৎসা মিলবে তার নিশ্চয়তা কি? এখন তো হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসা নিতে গেলে ডাক্তারদের দেখাই পাওয়া যায়না। হাসপাতালের জরুরি বিভাগে যে চিকিৎসক উপস্থিত থাকেন তিনি সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে একটি ওর্য়াডে পাঠিয়ে দিচ্ছেন।

 

তারপর রোগী আর চিকিৎসা পাবেন কিনা তা সৃষ্টিকর্তাই ভালো জানেন। কারণ ওর্য়াডে ভর্তি হওয়ার পর ওই রোগীর আর কেউ খোঁজ রাখেনা। রোগীর শারিরীক অবস্থার অবনতি ঘটলে হয়তো ইন্টার্নী চিকিৎসকদের দেখা পেলেও পাওয়া যেতে পারে।

 

কিন্তু যে ব্যক্তি ঘরের বাইরের চাপ নিতে গিয়ে অসুস্থ হয়েছেন তিনি কি হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে নিশ্চিন্তে একটু ঘুমাতে পারছেন? না সেখানে বসেও তার ভাবতে হচ্ছে হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেলেইতো আবার পাওনাদাররা তাগিদ দেয়া শুরু করবে। ভাড়া দিতে না পারলে বাড়ীওয়ালা ঘর থেকে নামিয়ে দেবে। তখন কোথায় গিয়ে উঠবেন। দোকান মালিক যদি দোকান ছাড়তে বলেন তাহলে কি করবেন? হয়তো কিস্তির টাকা আদায়ে সমিতির লোকজন ঘরের মালামাল বা দোকানের মালামাল নিয়ে নেবে। ওষুধের জন্য সবটাকা শেষ করলে রান্নার জন্য চাল কিনবে কিভাবে? আসলে এসব ভাবনা ভাবতে ভাবতে ওই ব্যক্তির আর সুস্থ হওয়াই হয়ে উঠেনা। চাপ নিয়ে হাসপাতালের হেটে যাওয়া ব্যক্তিটির হয়তো শেষ পর্যন্ত লাশ হয়েই ফিরতে হয়। না পুরোপুরি এমনটাইযে ঘটছে তা বলছিনা। কিন্তু পরিস্থিতি এমনই হয়ে দাঁড়াচ্ছে। নিম্ন মধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্ত পরিবারের এসকল দূর্দশা কাটাতে এখনই পদক্ষেপ গ্রহন করা উচিত বলে মনে করি। তা নাহলে পরিস্থিতি খারাপ থেকে আরো খারাপতর হবে। সমাজে বাড়বে অস্থিরতা। বাড়বে মৃত্যুর মিছিল। বোধ করি বর্তমান মানবিক সরকার এটা কিছুতেই হতে দেবেন না।

লেখকঃ সাবেক সাধারণ সম্পাদক, বরিশাল সাংবাদিক ইউনিয়ন।